তারিখ : আ বেঙ্গলী ক্লাসিক

নীলা চেনেন? একধরনের পাথর, যা নাকি কোনো কোনো মানুষের কাছে আলাদিনের জিন সমান। আবার কারো কাছে তা দুঃখের বার্তা বয়ে আনে। তবে সে যাই হউক না কেন, এই নীলাকে একবার ধারণ করলে তা থেকে আপনার নিস্তার নেই। ফেলে আসা মুহূর্তেরা, যা বর্তমানে শুধুই স্মৃতি, তাও অনেকটা এমনই। চলার পথে ক্ষণিকের থমকে দাঁড়ানোয় যদি স্মৃতির ভীড়ে একটিবার তাকান তবে তা আপনাকে সম্মোহিত করতে বাধ্য। জীবনের পথ যত বেশি অতিক্রম করবেন, স্মৃতি ততই বৈচিত্র্যময় হবে। আর একবার সে ছায়াপথের গোলকধাঁধায় আপনি যদি হারান তবে রোলার কোস্টার রাইড শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনার ছাড় নেই। এমনই বৈচিত্র্যপূর্ণ স্মৃতির টাইমলাইন ধরে আলোকবর্ষ পথ যদি হেঁটে যাওয়া যায়, তবে তা ‘তারিখ’ এর মত চলচ্চিত্রের আকার ধারণ করে। তবে অসুবিধে একটাই, সে টাইমলাইনে প্রতিটা মূহুর্ত দেখা যায়, অনুভব করা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায়না। মনে হবে আপনি যেন বিতর্কিত টাইমমেশিনের ভীষণ বাস্তব এক সওয়ারী। জীবন নামক সে টাইমলাইনে প্রবেশ করলে দেখা যায় বহমান সময়ের দূর্বার গতিকে। উপলব্ধি হয় অমরত্বের প্রত্যাশা ঠিক কতটা মিথ্যে। বোঝা যায় নির্ধারিত টাইমলাইনের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করায় ঠিক কতটা সুখ এবং তার চেয়ে বড়ো সত্য আর নেই।

‘নির্বাসিত'(২০১৪) এর পর বাংলা ছবিতে পরিচালিকা হিসেবে আবারও দেখা গেল চূর্ণী গাঙ্গুলীকে। প্রথম ছবিতে জাতীয় পুরস্কার জেতায় এবারে তার দায়িত্ব আরো অনেক বেশি। তাই এবারে তিনি তার ছবির বিষয় হিসেবে নির্বাচন করলেন একটি ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ইভেন্ট। ‘তারিখে’র থিম হল মৃত্যু, তবে তা মেলে ধরতে তথাকথিত ডার্ক শেড ব্যবহার করে ছবিটিকে ডিপ্রসিং করেননি পরিচালক। জীবনের চিরন্তন সত্য হল মৃত্যু। আমরা সেই মৃত্যুকে সবসময় অবচেতনে রেখে চলতেই ভালোবাসি। অবচেতন মনে ঠাঁই পাওয়া সে ধ্রুব সত্যকে আতসকাঁচের নীচে এনেছে ‘তারিখ’, চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে তার। তবে ছবির ফোকাস মৃত্যুতে নয়, মৃত্যুর আনুষঙ্গিক দিকগুলিতে। এক্ষেত্রে ছবির একটি সংলাপ ভীষণ প্রাসঙ্গিক – ” যারা গেল, তারা তো গেল। বাট যারা সারভাইভ করল, দ্যাট ফর মি ইজ দ্য রিয়েল স্টোরি”। সিনেমাটি দর্শককে এমন এক ধূসর দিগন্তের সন্ধান দেয় যেখানে একাকার হচ্ছে বাস্তব এবং ভার্চুয়াল জগৎ। বাস্তবে পাওয়া-হারানোর দিনপঞ্জি হয়ে ওঠে ফেসবুকের টাইমলাইন। শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়াকে কারণে অকারণে দুষবার যে প্রবণতা দেখা যায় আমাদের চারপাশে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেও চ্যালেঞ্জ জানায় এই ছবি।

মূলত তিনটি চরিত্রের উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরো ছবিটি। আদর্শবাদী অনির্বাণ (শাশ্বত) পেশায় অধ্যাপক, যে রাধে সে চুলও বাঁধে গোছের চরিত্র ইরা (রাইমা) ও বাস্তববাদী রুদ্রাংশু (ঋত্বিক)। অনির্বাণের ফেসবুক প্রোফাইলের টাইমলাইনে যাত্রা করে রহস্য উন্মোচন হয় তিনটি জীবনের। এই অ্যাডভেঞ্চার রাইডে কখনো স্ট্যাটাস, কখনো আপলোডেড ইমেজ আবার কখনো বিশেষ কারো সাথে ইনবক্সে চ্যাট হয়ে ওঠে ছবিটির প্লাটফর্ম। শহুরে বুদ্ধিজীবী অনির্বাণ স্বপ্ন দেখে রক্তে ভেজা রাতের শেষে নতুন দিন দেখবার। চরিত্রটির জীবনের গানে তাই দিনবদলের সুর শোনা যায়। এক বিশেষ কারণে সে ক্রান্তি ঘটানো তার পক্ষে সম্ভবপর হয়না। তাই আন্তর্জালিক দুনিয়ায় নিজ বুদ্ধিমত্তার জানান দিয়েই ক্ষান্ত হয় সে। অনির্বাণের স্ত্রী ইরা এক বিলাসবহুল হোটেলের রিসেপসনিস্ট। রুদ্রাংশু ব্যাবসায়ী মানুষ ও অনির্বাণের বেষ্ট ফ্রেন্ডও বটে। ছবিতে এছাড়াও রয়েছে ব্যাক্তিক আবেগ, দোলাচল চিত্ত, পুরুষতান্ত্রিক ঘেরাটোপ অতিক্রম করে সাম্যের সুর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, কমিউনিজম্ আরো অনেক কিছু।

অপেরা মুভিজ প্রযোজিত এই ছবির গল্পের আইডিয়া খুবই সময়োপযোগী। সেইসাথে উল্লেখ করতেই হয় ছবির এমন অভিনব চিত্রনাট্যের কথা। পরিচালনার ক্ষেত্রে আবারো সফল চূর্ণী গাঙ্গুলী। ছবির প্লট নির্মাণ থেকে শুরু করে চরিত্র নির্মান সবেতেই কৃতিত্বের দাবিদার পরিচালিকা। চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে অভিনেতা অভিনেত্রীদের কথা বলতে হবে এবারে। শাশ্বত চ্যাটার্জি যে কি উচ্চমানের চরিত্রাভিনেতা বাংলা ছবির দর্শক তার পরিচয় পেয়েছে কমলেশ্বরের ‘মেঘ ঢাকা তারা’তে। ‘তারিখে’ সেই লেগেসিই ধরে রাখলেন শুভেন্দু পুত্র। চরিত্র অনুযায়ী নিজ অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন রাইমা সেন ও ঋত্বিক চক্রবর্তী। পার্শ্বচরিত্র হিসেবে নির্ধারিত প্রতিটা ফ্রেমে যোগ্য সঙ্গত করে গিয়েছে শিশুশিল্পী অ্যাডোলিনা।

এবার আসা যাক ছবির টেকনিক্যাল পার্টগুলিতে। একটা ছবিকে গুড থেকে গ্রেট করে ছবির প্রত্যেকটি বিভাগের নিখুঁত হয়ে ওঠার চেষ্টা, বলা বাহুল্য এটাই ‘তারিখে’ সাফল্যের প্রধান কারণ। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি এককথায় আন্তর্জাতিক মানের। হাসি-কান্না, সাফল্য-ব্যার্থতা, একাকীত্ব-ভাবাবেগ এরকম বিভিন্ন মুড অনুযায়ী নেওয়া কিছু পরিকল্পিত শট ছবিটিকে একটি নতুন ফ্লেভার এনে দেয়। এছাড়া লন্ডনের ব্যাস্ততা, রাতে নিস্তব্ধতা চিড়ে বেরোনো কফিনবন্দী দেহ বাড়ি আনার সিনটির দৃশ্যায়ন সত্যিই অনবদ্য। এগুলি ছাড়াও ছবির ক্রিসপি এডিটিং, প্রয়োজনমাফিক ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ব্যবহার ভীষন কম্প্যাক্ট লাগবে এই ধারার ছবির দর্শকের কাছে। তবে ছবিটির একটি নেতিবাচক দিকও আছে। ছবিটি আদ্যোপান্ত একটি ইনটেলেক্ট ফিল্ম, যা কিনা সমাজের এক শ্রেণীর মানুষই শুধু কানেক্ট করতে পারবেন। তবু সবদিক বিচার করলে ৫ এর নিরিখে ৪ পাবে ‘তারিখ – এ টাইমলাইন’।

Leave a comment